‘দলিত ‘ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে প্রায় দেড়শো বছর আগে – মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের মুখ দিয়ে, অথচ, এই বঙ্গে শব্দটিকে প্রচলনে আনতে লোকেদের কালঘাম ছুটে গেছে। হয়তো এই দূরত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও একটি প্রশ্নের উত্তরও: শ্রমিক-কর্মচারীদের নিজস্ব পেশা অনুযায়ী সংগঠন থাকা সত্ত্বেও দলিত শ্রমিক-কর্মচারীদের আলাদা করে সংগঠন কেন গড়তে হয়, এবং গড়ার পরেও সে-গুলো ট্রেড-ইউনিয়ন বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়ে না।
প্রথমত, ট্রেড ইউনিয়নগুলো যদি দলিত শ্রমিক-কর্মচারীদের সংবিধানসম্মত সুযোগসুবিধা আদায় ও তাদের মর্যাদার প্রশ্নে আন্তরিক থাকতো তাহলে স্বতন্ত্র দলিত সংগঠনের প্রয়োজন হতো না । কিন্তু, শ্রেণি রাজনীতির মাহাত্ম্যের কাছে জাত প্রশ্নটি বিভেদকামী ও প্রতিক্রিয়াশীল। অতএব, দলিতের অস্তিত্ব যেমন তার অমর্যাদার মধ্যেই থেকে গেছে, বৃহৎ শক্তিগুলির কাছে দৃশ্যমান হয়নি, তেমনি তাদের দাবি নিয়ে সরব হবার দায়িত্বটাও দলিতদের উপরই বর্তেছে – সামাজিক পরিসরে তার জায়গা হয়নি। ফলে অফিস কাছারীতে কর্মরত দলিত মানুষ নিজের নিজের ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যপদ বজায় রেখেও নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে।
এর একটা অতীত আছে। মহারাষ্ট্রে জ্যোতিরাও ফুলের সত্যশোধক আন্দোলনের সহযোগী – যাকে ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়নের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তিনি নারায়ণ মেঘাজী লোখান্ডে । গুরুচাঁদ ঠাকুরের সমবয়সী । ১৮৯০ সালে বোম্বে হ্যান্ডস মিল এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা । নিয়মিত প্রকাশ করতেন দীনবন্ধু নামে পত্রিকা । শ্রমিকদের জন্য রবিবার ছুটির দিন আদায় ও ভারতের প্রথম ত্রিপাক্ষিক বৈঠকেরও কারিগর ।
বঙ্গীয় কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ও পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য, বহুভাষাবিদ বিরাটচন্দ্র মন্ডল ১৯২৫ সালে গঠন করেন কাঁচড়াপাড়া রেলওয়ে ওয়ার্কসম্যান ইউনিয়ন । ১৯২৭ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটুটারি কমিশনের সামনে ওই ইউনিয়নের পক্ষে ভারতীয় শ্রমিকদের ভবিষ্যত ও তাদের প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে সাক্ষ্য দেন ।
তিরিশের দশকের মাঝামাঝি বাবু জগজীবন রামের হাত ধরে গড়ে ওঠা ভারতীয় ডিপ্রেসড ক্লাসেস লীগের সভাপতি ছিলেন বাংলার রসিকলাল বিশ্বাস, ঐতিহাসিক পুনা চুক্তির স্বাক্ষরকারীর অন্যতম। তাঁর কলকাতার বাসভবন থেকেই ‘জাগরণ ‘ ও ইংরেজিতে প্রকাশিত হতো ‘ পিপলস হেরাল্ড ‘ – দ্বিতীয়টির উদ্বোধন করতে এসেছিলেন স্বয়ং বি আর আম্বেদকর । এই গতিশীলতা আবার জোর পেয়েছিল, গুরুচাঁদ ঠাকুরের গভীর ও বহুব্যাপী শিক্ষা আন্দোলনের দ্বারা ।
বলার কথা এই যে, মহারাষ্ট্রের মতো অখন্ড বাংলায়ও দলিত আন্দোলনের একটা জোরালো ধারা বহমান ছিল । না হলে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কংগ্রেসের আপ্রাণ বাধাদান সত্ত্বেও আম্বেদকরকে বাংলা থেকে নির্বাচনে জিতিয়ে গণপরিষদে পাঠাতে পারতেন না । ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও পত্রিকার বিষয়বস্তু থেকে প্রমাণ করা কঠিন নয় যে, দলিত চেতনার পাশাপাশি শ্রেণি-চেতনার উপাদানও তাতে কিছু কম ছিল না । এই চেতনারই পরবর্তী প্রকাশ দলিত কর্মচারী সংগঠন – অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ভিন্ন এক রাজনৈতিক কন্ঠস্বর উঠে এল।
স্পষ্ট করে বললে, স্বাধীন ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য শিক্ষা ও চাকুরিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয় । ফলে সরকারি দপ্তরগুলিতে দলিত মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে । তারা বাস্তব অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারে তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মানুষ তাদের এই উপস্থিতি সহজভাবে মানতে পারছেন না । চাকুরিতে এতদিনের একচেটিয়া আধিপত্য হারাতে উচ্চবর্ণের মানুষ রাজি ছিলেন না । সহকর্মী হলেও ব্যক্তিগত বা ট্রেড ইউনিয়ন স্তরে দলিত মানুষের সহমর্মী হওয়া তাদের পক্ষে বেশ কষ্টকর ছিল ।
ষাটের দশকের একেবারে শেষ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ব্যাংক, জীবনবীমা সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জাতীয়করণ করেন এবং সেখানে সংরক্ষণ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি হয় । অনেক দলিত মানুষের চাকুরিতে প্রবেশাধিকার ঘটে । সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে দলিত কর্মচারীদের সামনে নিজেদের সংগঠিত করার একটা সুযোগ য়াসে। রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব না থাকা সত্ত্বেও রেল, ডাক-তার, ব্যাংক , জীবন বীমা , ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স, কোল ইন্ডিয়ার মতো সংস্থায় এবং রাজ্য সরকারী দপ্তরে গড়ে ওঠে দলিত কর্মচারী সংগঠন । নামে কল্যানমূলক সংগঠন হলেও এগুলো চরিত্রে ছিল ট্রেড ইউনিয়নের মতো। আম্বেদকর চর্চা, মুখপত্র প্রকাশ, সম্মেলন, সেমিনার, ইত্যাদি মধ্য দিয়ে তাদের ঐক্যবোধ সম্প্রসারিত হতে শুরু করে ।
ট্রেড ইউনিয়নের পদাঙ্ক অনুসরণ করে গড়ে ওঠে দলিত কর্মচারীদের ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন, দলিত কর্মচারী সংগঠনের কো-অর্ডিনেশন — ১৪ ই এপ্রিল কমিটি । মূলত উচ্চ শিক্ষায় দলিত মানুষের বাধা হিসেবে একটি সার্কুলার প্রত্যাহারের দাবিতে এই কমিটির ডাকে ১৯৯৫ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে শিয়ালদা স্টেশনের বাইরের চত্বরে ১১ দিন ব্যাপী আমরণ অনশন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা । এর ফলশ্রুতিতে রাজ্য সরকার অধ্যাপক বাসুদেব বর্মনকে নিয়ে একটি কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়।
কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত বাংলার সমাজে এই সংগঠনগুলি সম্পর্কে জানবার আগ্রহ যতটা কম, এঁদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদানের কথা বিস্মরণের মাত্রা ততটাই বেশি। উদারপন্থী বাংলার কাছে দলিত বাংলা চিরকালীন অস্পৃশ্যতার অভিজ্ঞান হয়েই থেকে গেছে।
- নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস
প্রাক্তন সম্পাদক, পথ সংকেত পত্রিকা
ই-মেল: narayanbiswas3009@gmail.com
ফোন: 8777785294
লেখাটি আনন্দ বাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল 2 জুলাই 2024 । শিরোনাম ছিল — নিজেদের সংগঠন , স্বতন্ত্র দাবি ।